প্রিন্ট এর তারিখ : ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৩ অক্টোবর ২০২৬
চকবাজার মনসুর খান প্লাজায় আগুনে ছয়তলা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছো
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামান বলেছেন, চকবাজারের মনসুর খান প্লাজার আগুন বর্তমানে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে, গুদামে থাকা মালামাল সরানো এবং আগুন পুরোপুরি নির্বাপণের কার্যক্রম চলছে। আগুনে ছয়তলা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাততলায় সামান্য ক্ষতি হয়েছে। এ ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের চার সদস্য আহত হয়েছেন।মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালে চকবাজারের মনসুর খান প্লাজায় আগুনের ঘটনায় এক ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।কাজী নজমুজ্জামান বলেন, গতকাল বিকেল ৫টা ৪ মিনিটে চকবাজারের মনসুর খান প্লাজায় অগ্নিকাণ্ডের খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লালবাগ থেকে দুটি ইউনিট, সদর দপ্তর সিদ্দিকবাজার থেকে দুটি ইউনিট এবং পলাশী থেকে আরও দুটি ইউনিটসহ মোট ছয়টি ইউনিট ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হয়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখেন, ছয় ও সাততলায় প্রচণ্ড ধোঁয়া ও তাপ। এর মধ্যেই ফায়ার সার্ভিসের কৌশল প্রয়োগ করে আগুন নেভানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ছয়তলায় থাকা গোডাউনগুলোতে শাটার ও তালা লাগানো ছিল। প্রতিটি গোডাউনে চার-পাঁচটি তালা ছিল। ভেতরে ক্রসফায়ার গেটেও তালা লাগানো ছিল। প্রচণ্ড ধোঁয়া ও তাপের মধ্যে এসব তালা কেটে আগুন নেভানোর কাজ করতে হয়েছে।তিনি বলেন, ভোর ৫টা ২০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। আগুন নেভানোর ক্ষেত্রে কয়েকটি চ্যালেঞ্জ ছিল। এর মধ্যে প্রথমটি ছিল যানজট। চকবাজারের রাস্তা অত্যন্ত সরু হওয়ায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগে। বিশেষ করে, তখন পিক আওয়ার থাকায় যানজট বেশি ছিল।দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ ছিল ভবনের ভেতরে জমে থাকা ধোঁয়া বের হওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকা। ছয় ও সাততলার ধোঁয়া বের হওয়ার পথ না থাকায় প্রচণ্ড তাপ ও ধোঁয়ার মধ্যে ফায়ারফাইটারদের কাজ করতে হয়েছে। শাটারের তালা কেটে আগুন নেভানোর কার্যক্রম চালাতে হয়েছে।পানির সংকটের কথা উল্লেখ করে কাজী নজমুজ্জামান বলেন, আশপাশে থাকা পানির রিজার্ভগুলো শেষ হয়ে যাচ্ছিল। এ কারণে পাম্প ও রিজার্ভার পরিবর্তন করে অন্য রিজার্ভার থেকে পানি নিয়ে আগুন নেভানোর কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হয়েছে।বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ভবনের ভেতরে এখন আর আগুন নেই। তবে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত মালামাল গোডাউনভর্তি থাকায় সেগুলো সরানো হচ্ছে এবং পানি দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে মাঝে মাঝে ধোঁয়া বের হচ্ছে।তিনি বলেন, আগুন নির্বাপণের কার্যক্রম এখনো চলমান। বিভিন্ন গোডাউন পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। মালামাল সরানো না হলে, আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ করা সম্ভব হবে না। কারণ, মালামালের নিচে থাকা তাপ ও ধোঁয়া থেকে আবার আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ কারণে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে অবস্থান করছেন।তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ছয়টি ইউনিট কাজ করছে। মালামাল সরানো ও পানি দেওয়ার কাজ চলছে। আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ না করে ফায়ার সার্ভিস চলে গেলে আবার আগুন জ্বলে উঠতে পারে।কাজী নজমুজ্জামান বলেন, মনসুর খান প্লাজার ছয়তলায় ১২ থেকে ১৪টি বড় গোডাউন রয়েছে। এর মধ্যে সাত থেকে আটটি গোডাউনে আগুন লেগেছিল। এসব গোডাউনে ছাতা, কসমেটিকস, আতরের বোতল, আতরসহ বিভিন্ন ধরনের মালামাল ছিল। গোডাউনগুলো মালামালে পূর্ণ থাকায় সেগুলো সরিয়ে আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ করতে সময় লাগছে।ক্ষয়-ক্ষতির বিষয়ে তিনি বলেন, কত টাকার মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট মালিকপক্ষ বলতে পারবে। এটি নির্ধারণ করতে কিছুটা সময় লাগবে।অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে কাজী নজমুজ্জামান বলেন, আগুন নির্বাপণের কার্যক্রম চলমান থাকায় এখনই এর কারণ বলা সম্ভব হচ্ছে না। এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তদন্তের পর আগুন লাগার প্রকৃত কারণ জানা যাবে।তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত যাদের সঙ্গে কথা হয়েছে, তারা কেউই আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি। ভবনে বিদ্যুতের লাইন থাকায় বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগার সম্ভাবনা থাকতে পারে। তবে তদন্তের পরই বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।কাজী নজমুজ্জামান বলেন, মনসুর খান প্লাজার সঙ্গে আরও তিন থেকে চারটি মার্কেট যুক্ত রয়েছে। আগুন আশপাশের ভবন ও দোকানে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল। বিভিন্ন সময় আগুন বাইরে ছড়িয়ে পড়ছিল। তবে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন, যাতে আগুন অন্য ভবন ও দোকানে ছড়িয়ে না পড়ে।তিনি বলেন, মানুষের আশঙ্কা অনুযায়ী পুরো মার্কেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। মূলত ছয়তলা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাততলায় সামান্য ক্ষতি হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণে আশপাশের মার্কেটগুলোকে বড় ধরনের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।তিনি আরও বলেন, আগুন নেভানোর সময় প্রচণ্ড তাপ ও ধোঁয়ার মধ্যে ফায়ারফাইটাররা কাজ করেছেন। একজন সদস্য ১৫ থেকে ২০ মিনিট কাজ করার পর তাকে সরিয়ে অন্য সদস্যকে পাঠানো হয়েছে। এভাবে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ জনবল নিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার কাজ করা হয়েছে।এ সময় মার্কেটের স্বেচ্ছাসেবক, আশপাশের লোকজন, পুলিশ ও অন্যান্য সংস্থা সহযোগিতা করেছে। ওয়াসা কর্তৃপক্ষও পানি সরবরাহ করেছে বলে জানান তিনি।চকবাজারের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও ব্যস্ত ব্যবসাকেন্দ্রে অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে কাজী নজমুজ্জামান বলেন, চকবাজার একটি ঐতিহ্যবাহী ব্যবসাকেন্দ্র ও পাইকারি বাজার। এখানে সব সময় মানুষের চলাচল থাকে। যানজটের কারণে স্বাভাবিক সময়েও রিকশা ও অন্যান্য যানবাহন চলাচলে সমস্যা হয়। অগ্নিকাণ্ডের সময় যানজটের কারণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দেরি হয়।এ সমস্যা সমাধানে রাস্তাগুলো প্রশস্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। পাশাপাশি ঢাকা সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষকে হাইড্র্যান্ট ব্যবস্থা চালুর পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ওয়াসার মাধ্যমে হাইড্র্যান্ট ব্যবস্থা করা গেলে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা নির্দিষ্ট পয়েন্টে গিয়ে ডেলিভারি পাইপ সংযুক্ত করে দ্রুত পানি নিয়ে আগুন নেভানোর কাজ করতে পারবেন।আগুন নেভাতে শুধু পানি ব্যবহার করা হচ্ছে কেন, এমন প্রশ্নের জবাবে কাজী নজমুজ্জামান বলেন, আগুনের শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী এটি সলিড ফায়ার। এ ধরনের আগুন নির্বাপণের উত্তম মাধ্যম হলো পানি। কোনো পেট্রোল পাম্পে বা অন্য কোনো জ্বালানিতে আগুন লাগলে ফোম ব্যবহার করা হতো। কিন্তু এটি সলিড ফায়ার হওয়ায় আগুন নেভাতে পানি ব্যবহার করা হচ্ছে।অগ্নিকাণ্ডে ফায়ার সার্ভিসের চার সদস্য আহত হয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রচণ্ড ধোঁয়া ও তাপের মধ্যে কাজ করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। ফায়ার সার্ভিসের নির্ধারিত কৌশল প্রয়োগ করে কমসংখ্যক সদস্যকে আহত করে আগুন পুরোপুরি নির্বাপণের চেষ্টা করা হয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মো: মনিরুজ্জামান (মনির)
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক রেলওয়ে বার্তা । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত