প্রিন্ট এর তারিখ : ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৭ অক্টোবর ২০২৬
বিশ্বকাপের সেই ম্যাচের আগে কী হয়েছিল আর্জেন্টিনা দলে, মুখ খুললেন লাউতারোা
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
২০২৬ বিশ্বকাপে শিরোপা ধরে রাখার খুব কাছে চলে গিয়েছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু শেষমেশ স্পেনের কাছে হেরে রানার্স আপ হয়েই বিদায় নিতে হয় লিওনেল মেসির দলকে। তবে তার আগে তারা এমন এক ম্যাচ খেলেছে, যা তাদের ইতিহাসকে উসকে দিয়েছে আরও একবার। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই ম্যাচটা শেষের পর নানা কারণে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। তার আগে ম্যাচটা জেতানো লাউতারো মার্তিনেজ এবার মুখ খুলেছেন সেই ইস্যুতে। জানালেন সেই ম্যাচের আগে কী হয়েছিল আর্জেন্টিনা দলে।ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে ইংল্যান্ডের সঙ্গে আর্জেন্টিনার পুরোনো বিরোধ আছে। লাউতারো জানিয়েছেন, এই বিরোধ ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে দলের মধ্যে আলাদা আবেগ তৈরি করেছিল। তিনি ম্যাচটিকে শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ মনে করেননি। নিজের জয়সূচক গোলটি তিনি ১৯৮২ সালের যুদ্ধের সৈনিকদের উৎসর্গ করেছেন।১৫ জুলাই আটলান্টায় সেমিফাইনাল ম্যাচ হয়। পিছিয়ে পড়েও আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে ইংল্যান্ডকে হারায়। ইন্টার মিলানের এই স্ট্রাইকার ৯২ মিনিটে জয়সূচক গোলটি করেন। এতে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। আর্জেন্টাইনরা এই দ্বীপের যুদ্ধকে নিজেদের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় মনে করেন। তাই গোলটির মূল্য ফলাফলের চেয়েও বেশি হয়ে উঠেছিল।এএফএ স্টুডিওকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মার্তিনেজ আবেগে ভেসে যান। তাকে একটি ভিডিও দেখানো হয়। সেখানে মালভিনাস যুদ্ধের এক সৈনিক তার গোল উদ্যাপন করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন।মার্তিনেজ বলেন, ‘এটা তাদের জন্যই সম্ভব হয়েছে [ফকল্যান্ড যুদ্ধের আর্জেন্টাইন সৈনিক], সে সময় তারা যেভাবে আমাদের দেশকে তুলে ধরেছিলেন তার জন্য। আজ অন্তত আমি এই গোলটা তাদের উৎসর্গ করতে পারি। তারা আজ জাতীয় দলের সঙ্গে নিজেদের মেলাতে পারছেন, এটা আমরা এই সময়ে যা গড়েছি তারই প্রমাণ।’তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যত পুরস্কার, স্বীকৃতি ও প্রশংসা পাচ্ছি, সবই তাদের কারণে। কীভাবে লড়তে হয়, তা তারাই আমাদের শিখিয়েছেন।’ম্যাচের আগে আর্জেন্টিনা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে চায়নি। কোচ লিওনেল স্কালোনি বলেছিলেন, তিনি চান না ম্যাচটি এই যুদ্ধ নিয়ে হোক। কিন্তু মার্তিনেজের কথায় ড্রেসিংরুমের আবেগের কিছুটা আভাস মিলল। প্রকাশ্যে খেলোয়াড়েরা ফুটবল ও রাজনীতিকে আলাদা রেখেছিলেন।মার্তিনেজ বলেন, ‘ক্যামেরার সামনে আমাদের অন্যভাবে চলতে হয়েছে, কারণ এটা একটা ফুটবল ম্যাচ। কিন্তু ভেতরে এটা অন্য ম্যাচের মতো ছিল না। পুরো ইতিহাসের কারণে এটা বিশেষ ছিল।’তিনি আরও বলেন, ‘ফকল্যান্ডস ইস্যু ছিল একটি বিশেষ উপাদান।’ তার মতে, এটি দলকে ‘বাড়তি শক্তি ও সেই ইতিবাচক ইতিবাচক উদ্দীপনা’ দিয়েছে, যা এ ধরনের ম্যাচ খেলতে দরকার।দুই দেশের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার শিকড় অনেক গভীরে। ১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনার সেনারা দ্বীপে নামলে ৭৪ দিনের যুদ্ধ হয়। ব্রিটেনে দ্বীপগুলো ফকল্যান্ড নামে পরিচিত। আর্জেন্টিনায় এর নাম ইসলাস মালভিনাস। যুদ্ধে ৬৫৫ জন আর্জেন্টাইন ও ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা নিহত হন। তিনজন দ্বীপবাসীও মারা যান। ১৯৮২ সালের জুনে ব্রিটিশ বাহিনী দ্বীপগুলো আবার দখলে নেয়। তবে সার্বভৌমত্বের বিরোধ এখনো মেটেনি।সেমিফাইনালের পর রাজনৈতিক প্রসঙ্গ আবার সামনে আসে। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় লিসান্দ্রো মার্তিনেজ ও জিওভানি লো চেলসো গ্যালারির সামনে উদ্যাপনের সময় একটি ব্যানার তুলে ধরেন। তাতে লেখা ছিল ‘লাস মালভিনাস সন আর্হেন্তিনাস’, অর্থাৎ ‘ফকল্যান্ড আর্জেন্টিনার’। ব্যানারটি কোথা থেকে এল, তা পরিষ্কার নয়। ফিফা পরে বিষয়টির তদন্ত শুরু করেছে। স্টেডিয়ামে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া ফিফার নিয়মের লঙ্ঘন বলে মনে করা হচ্ছে।লাউতারোর কাছে গোলের ব্যক্তিগত তাৎপর্য বুঝতে সময় লেগেছিল। ম্যাচের পর হেডের দৃশ্য বারবার দেখানো হয়। তিনি বলেন, ‘এটা এমন এক স্মৃতি, যা আমি চিরদিন আগলে রাখব।’ টুর্নামেন্টের তীব্রতা আর কয়েক দিন পরের ফাইনালের কারণে তিনি ‘গোলটা যে করেছি, সেটা পুরোপুরি টের পাননি’ বলে স্বীকার করেন।তিনি আরও বলেন, ‘দেশে ফিরে যখন আর্জেন্টাইনদের সঙ্গে দেখা হলো, তখন আমি এটা অনুভব করলাম। গোলটার অর্থ বোঝাতে মানুষ আমাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছিল। তখনই আমি এর গুরুত্ব বুঝলাম।’ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অসাধারণ জয়ের পর আর্জেন্টিনার সামনে ছিল স্পেনের বিপক্ষে ফাইনাল। দলে ছিলেন দুর্দান্ত ফর্মে থাকা লিওনেল মেসি। ২০২২ সালের চ্যাম্পিয়নরা দারুণ লড়াইয়ের আশা জাগিয়েছিল। কিন্তু ফাইনালে লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্পেনের কাছে তারা পুরোপুরি ম্লান হয়ে যায়। ম্যাচ শেষ হয় ১-০ ব্যবধানে। স্পেনের আধিপত্যের তুলনায় এই ব্যবধান কিছুই নয়।মার্তিনেজ বলেন, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ শরীর ও মন দুই দিক থেকেই দলকে ক্লান্ত করেছিল। তবে ফাইনালে দল সবটুকু দেয়নি, এ কথা তিনি মানেননি।তিনি বলেন, ‘ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ আমাদের অনেক শক্তি শেষ করে দিয়েছিল। আমরা যা পেরেছি সবই দিয়েছি, ফাইনালেও তা-ই। কিছু খেলোয়াড়কে মাঠ ছাড়তে হয়েছে। আমরা মাঠে সব উজাড় করে দিয়েছি, তা বোঝাও গেছে। কেউ কেউ হাঁটতে পারছিল না, তবু দৌড়াচ্ছিল।’তিনি আরও বলেন, ‘শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমাদের সুযোগ ছিল। মানুষ যখন ওই সব তত্ত্ব নিয়ে কথা বলে, তখন বিরক্ত লাগে। কারণ এটা পরিষ্কার যে আমরা সবকিছু দিয়েছি। এতে আমাদের মন শান্ত থাকে। প্রতিপক্ষ ছিল শক্তিশালী।’ইংল্যান্ডকে হারানোর স্মরণে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ১৫ জুলাইকে জাতীয় ফুটবল দিবস ঘোষণা করেছে। এই জয় ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের স্মৃতিও ফিরিয়ে এনেছে। সেই ম্যাচে দিয়েগো মারাদোনা বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল এবং বিখ্যাত একক গোলটি করেছিলেন।পুরো অভিযান নিয়ে মার্তিনেজ বলেন, সমর্থকদের সঙ্গে দলের যোগাযোগ সাফল্যের মূলে ছিল।তিনি বলেন, ‘এটা খুব তীব্র একটি বিশ্বকাপ ছিল। প্রতিটি ম্যাচ ছিল কঠিন। সমর্থকেরা আমাদের সঙ্গে, আমাদের পথচলার সঙ্গে নিজেদের মিলিয়েছেন। আমাদের এই দল এমন একটি দল, যে কখনো হাল ছাড়ে না, সব সময় আরও চায়। আর আছেন লিও [মেসি]র মতো নেতা, যিনি আমাদের হার না মানতে শিখিয়েছেন।’
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মো: মনিরুজ্জামান (মনির)
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক রেলওয়ে বার্তা । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত