প্রিন্ট এর তারিখ : ২৬ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৬ অক্টোবর ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
মাছ শিকারে চলমান নিষেধাজ্ঞায় পিরোজপুরের বাজারগুলোতে কমেছে মাছের সরবরাহ। চাহিদার তুলনায় বাজারে শীতকালীন সবজিও কম উঠছে। এ ছাড়া চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস এবং ডিমসহ বেড়েছে প্রায় সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। ফলে বাড়তি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে স্থানীয় ক্রেতাদের। এ অবস্থায় বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। বিশেষ করে সংসারের খরচ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সীমিত আয়ের মানুষদের। বাজার পরিস্থিতির এমন ঊর্ধ্বগতির কারণে বর্তমানে পিরোজপুরের অধিকাংশ ক্রেতাদের অভিযোগ, আয় না বাড়লেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পেছনে বেড়েছে ব্যয়। ফলে সংসারের অন্যান্য খরচ কমিয়ে খাবারের চাহিদা মেটাতে হচ্ছে অনেককে। মাছের বদলে সবজি অথবা সবজির বদলে ডিম কিনে খরচ কমানোর বিকল্প খুঁজেও স্বস্তি মিলছে না তাদের। এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বাজার মনিটরিং জোরদার করে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ক্রেতারা। আর ব্যবসায়ীদের দাবি, কোনো কোনো সবজির দাম কিছুটা কমলেও শীতকালীন সবজির সরবরাহ কম থাকায় বাজারে এখনো দাম তুলনামূলক বেশি। সরবরাহ বাড়লে ধীরে ধীরে কমবে সবজির দাম। রোববার (২৫ অক্টোবর) পিরোজপুর সদর উপজেলার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, দীর্ঘদিন ধরে চালের দাম বাড়তি রয়েছে। এ ছাড়া গত তিন মাসে তেল, ডিম ও রসুনের দাম বেড়েছে। এ ছাড়া নদীতে মাছ ধরার ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার কারণে বাজারে মাছের সরবরাহ কমেছে বলে দাবি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের। আর এ কারণেই ঘেরের মাছের দাম বেড়েছে। বাজারে ফুলকপি, শিম, টমেটো এবং কাঁচামরিচসহ বিভিন্ন সবজির দামও তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। বাজার ঘুরে আরও দেখা যায়, প্রতি লিটার সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ২০৪ টাকায়। যা তিন মাস আগে দাম ছিল ১৯৯ টাকা। অর্থাৎ, প্রতি লিটারে দাম বেড়েছে পাঁচ টাকা। আর ব্যবসায়ীদের দাবি, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় চালের দামে কেজিতে দুই থেকে তিন টাকা বেড়েছে। তবে গত কয়েক দিন ধরে দাম অনেকটাই স্থিতিশীল রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।বর্তমানে পোলাওয়ের চাল বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১৯০ টাকা। আর সাধারণ ভাতের চালের দাম প্রকারভেদে বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৭০ টাকায়। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত কয়েক মাসের তুলনায় বর্তমানে চালের দাম কেজিতে বেড়েছে দুই থেকে তিন টাকা। এ ছাড়া গত তিন মাস আগে প্রতি হালি ফার্মের মুরগির ডিম ৪০ থেকে ৪২ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে দাম বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৪৮ থেকে ৫০ টাকায়। হাঁসের ডিমের হালি ৬৫ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৭৫ টাকা। ফলে তুলনামূলক কম খরচে খাবারের চাহিদা মেটাতে ডিম কিনতেও বাড়তি টাকা খরচ করতে হচ্ছে সাধারণ ক্রেতাদের।পেঁয়াজের দাম কোজি প্রতি ১০ টাকা বেড়ে বর্তমানে ৪৫ টাকা। রসুনের দাম তিন মাস আগে ৬৫ টাকা থাকলেও এখন বেড়ে হয়েছে ৮০ টাকা। মসুর ডালের ক্ষেত্রেও দেশি ও আমদানি করা ডালের দামে পার্থক্য রয়েছে। আমদানি করা মসুর ডাল পাইকারিতে ৮২ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও খুচরা বাজারে দাম ৯০ টাকা। দেশি মসুর ডাল পাইকারিতে ১৪৮ থেকে ১৫০ টাকা এবং খুচরা বাজারে ১৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।ব্যবসায়ীদের দাবি, মাছের সরবরাহ কম থাকায় বাজারে আসা ঘেরের মাছের দাম কেজিতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এসব মাছের মধ্যে আকারভেদে রুই মাছ বিক্রি হচ্ছে ২৮০ থেকে ৩৩০ টাকায়, কোরাল ৭০০ থেকে ৮৫০ টাকা, চিংড়ি এক হাজার থেকে এক হাজার ৩৫০ টাকা, কই ২২০ টাকা। পিরোজপুর বাজারের মাছ ব্যবসায়ী মো. আলম শেখ বলেন, নদীতে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকায় বাজারে মাছ কম। ঘেরের মাছ যা আছে, সেগুলোর দাম বেশি। এসব মাছের দাম কেজিতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।তবে মাছের সরবরাহ কম থাকলেও স্বস্তি রয়েছে মুরগির বাজারে। বর্তমানে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি হচ্ছে ১৮০ টাকায়। সোনালি মুরগি ৩২০ টাকা, লাল মুরগি ৩৭০ টাকা, এবং দেশি মুরগি কেজি প্রতি বিক্রি হচ্ছে ৬৫০ টাকা। ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিন মাস আগে এসব মুরগির দাম বর্তমানে নির্ধারিত দামের তুলনায় কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেশি ছিল।গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ২০০ টাকা। ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, এ দুই ধরনের মাংসের দাম আগের তুলনায় খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। তবে মাছ-মাংসের দাম বেশি থাকায় সাধারণ ক্রেতারা স্বাভাবিকভাবে বাধ্য হয়ে শাকসবজি বেশি ক্রয় করেন। কিন্তু সেখানেও মিলছে না স্বস্তি।বর্তমানে পিরোজপুরে প্রতি কেজি টমেটো বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকা, ফুলকপি ১০০ টাকা, বেগুন ৮০ টাকা, শালগম ১২০ টাকা, লেবু ৩৫ টাকা, করলা ৬০ টাকা, গাজর ১৬০ টাকা, বাঁধাকপি ৬০ টাকা, শিম ১৪০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৫০ টাকা, পটোল ৫০ টাকা, লাউ ৫০ টাকা, পাতাকপি ৬০ টাকা, মুলা ৫০ টাকা এবং শসা ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতি কেজি কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা।স্থানীয় ক্রেতাদের দাবি পিরোজপুরে গত কয়েক মাস ধরেই সবজির দাম কিছুটা বেশি রয়েছে। এর আগে গত ২ অক্টোবর বাজারে বেগুনের দাম ছিল কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ১০০ টাকা, করলা ৭০ থেকে ৯০ টাকা, পটোল ৫০ থেকে ৭০ টাকা, ঢ্যাঁড়স ৬০ থেকে ৮০ টাকা, চিচিঙ্গা ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং কাকরোল ৮০ থেকে ৯০ টাকা। ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দিনের ব্যবধানে তখন অধিকাংশ সবজির দাম কেজিতে ২০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছিল। তবে বেশি পরিমাণ শীতের সবজি বাজারে আসলে সবজির দাম কিছুটা কমবে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা। সবজি ব্যবসায়ী রাতুল বলেন, শীতের সবজি পুরোদমে বাজারে উঠলে দাম কমে যাবে। এখন কিছু সবজির দাম বেড়েছে, আবার কিছু সবজির দাম কমেছে। সরবরাহ কম থাকায় শীতের কিছু সবজির দাম এখন তুলনামূলক বেশি। বাজার করতে আসা ফাহিম ইসলাম নামে এক ক্রেতা বলেন, সবকিছুর দাম দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। আমরা চাকরিজীবী, আমাদের তো বেতন বাড়ছে না। কিন্তু বাজার করতে এলে যেটাই কিনতে যাই, সেটারই দাম বেশি।আজিজুল নামে আরেক ক্রেতা বলেন, বর্তমানে বাজারের দাম সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে চলে গেছে। সাধারণ মানুষ খুব সমস্যায় আছে। প্রতিটি জিনিসের দাম বেশি। সবজি কিনতে গেলেও ৬০-৭০ টাকার নিচে ভালোভাবে কিছু পাওয়া যাচ্ছে না। চালের দাম, তেলের দাম সবকিছুতেই বাড়তি চাপ। এতে সাধারণ মানুষ খুব সমস্যায় আছে।বর্তমান বাজার পরিস্থিতির বিষয়ে পিরোজপুর কাঁচা বাজার সমিতির সাধারণ সম্পাদক জালিস মাহমুদ বলেন, চালের দাম তুলনামূলক কিছুটা বেড়েছে। সবজির দাম গত সপ্তাহের চেয়ে তুলনামূলক কম। মরিচ, বেগুন, পটল, লাউ এসবের দাম কিছুটা কমেছে। শীতকালীন কিছু সবজি বাজারে আসতে শুরু করেছে। যার কারণে সবজির দাম আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। শীতকালীন সবজির সরবরাহ বাড়লে দাম আরও কমবে।পিরোজপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইফতেখারুল ইসলাম শামীম বলেন, ক্রেতারা যাতে ন্যায্যমূল্যে পণ্য কিনতে পারেন, সে জন্য উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত বাজার মনিটরিং করা হচ্ছে। কোনো অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে গিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। সামনে বাজার মনিটরিং আরও জোরদার করা হবে।