ঢাকা   মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক রেলওয়ে বার্তা

গ্রামীণ জীবনের ঐতিহ্যবাহী পসরা যে বাজারে



গ্রামীণ জীবনের ঐতিহ্যবাহী পসরা যে বাজারে

রোববার এলেই বদলে যায় মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার টেংরা বাজারের চেহারা। সাপ্তাহিক হাটের দিনে চারপাশজুড়ে জমে ওঠে মানুষের আনাগোনা।

কোথাও সারি সারি গরু-ছাগল, কোথাও হাঁস-মুরগি ও কবুতরের হাট। আবার কোথাও বাঁশ-বেতের তৈরি নানান সামগ্রীর পসরা।

সব মিলিয়ে যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে চেনা গ্রামীণ বাংলার পুরোনো এক ছবি।

আধুনিকতার ছোঁয়ায় দেশের অনেক গ্রামীণ বাজারের চেহারা বদলে গেলেও টেংরা বাজার এখনো ধরে রেখেছে তার পুরোনো বৈশিষ্ট্য।

প্রায় দুইশ বছরের পুরোনো এই বাজার শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, স্থানীয় মানুষের কাছে এটি গ্রামীণ জীবনযাত্রার প্রয়োজন মেটানোর অন্যতম নির্ভরতার জায়গা।

হাটের এক পাশে সাজানো থাকে বাঁশ-বেতের তৈরি গৃহস্থালির নানা সামগ্রী।

টুকরি, খলই, দুছইন, হুপা, ঝাঁকা, কুলা, চালুন, বেতের মাথাল, সেঁউতি থেকে শুরু করে শীতলপাটি ও কেয়াপাতার পাটি, কী নেই সেখানে! গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত এসব সামগ্রী দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি টেকসই হওয়ায় এখনো রয়েছে এর চাহিদা।

বাজারে ঢুকলেই চোখে পড়ে নানা ধরনের ভ্রাম্যমাণ দোকান। কোথাও দা, কোদাল, খুন্তি ও অন্যান্য লোহার সামগ্রী, কোথাও মৌসুমি সবজির স্তূপ। খাসিয়া পান, বাংলা পান ও সুপারির জন্যও রয়েছে আলাদা জায়গা। গবাদিপশুর খাবার থেকে শুরু করে ঘরের নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা সামগ্রীও মেলে এই হাটে।

রোববারের হাটে পশুর আনাগোনাও কম নয়। বাজারের এক পাশে সারি সারি গরু খুঁটিতে বাঁধা। পাশেই ছাগলের ভিড়। রাস্তার পূর্ব পাশে বসে হাঁস-মুরগি ও কবুতরের হাট। ক্রেতারা এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরে দেখছেন, করছেন দরদাম। পছন্দ হলে কিনে নিচ্ছেন প্রয়োজনের জিনিস।

স্থানীয় টেংরা বাজার নামে পরিচিত হলেও হাটের ভেতরে ভটের বাজার ও বাগিচা বাজার নামেও দুটি অংশ রয়েছে। প্রতিদিনই এখানে স্থায়ী দোকানগুলোতে বেচাকেনা চলে। তবে রোববারের সাপ্তাহিক হাটে সেই স্বাভাবিক চিত্র বদলে যায়। দূর-দূরান্ত থেকে ক্রেতা-বিক্রেতাদের আগমনে জমে ওঠে পুরো এলাকা। সকাল থেকে শুরু হওয়া বেচাকেনা অনেক সময় গড়ায় গভীর রাত পর্যন্ত।

প্রবীণ ব্যবসায়ী সুদর্শন মালাকারের কাছে টেংরা বাজার শুধু একটি ব্যবসাকেন্দ্র নয়, দীর্ঘদিনের স্মৃতিও। তিনি বলেন, প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো এই বাজার একসময় পুরো রাজনগর এলাকার অন্যতম বড় হাট ছিল। প্রতি রোববার সকাল থেকে শুরু হয়ে অনেক সময় মধ্যরাত পর্যন্ত এখানে বেচাকেনা চলত।

বাঁশ-বেতের সামগ্রী বিক্রেতা বীরেন্দ্র মালাকারও দীর্ঘদিন ধরে এই বাজারের সঙ্গে যুক্ত। প্রায় ২৫ বছর ধরে তিনি এখানে পণ্য বিক্রি করছেন। তার ভাষায়, গেরস্তালির প্রয়োজনীয় অনেক কিছুই এই বাজারে পাওয়া যায়। স্থানীয়দের পাশাপাশি শহর থেকেও অনেকে এসব পণ্য কিনতে আসেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররা পণ্য নিয়ে এসে এখানে খুচরা দরে বিক্রি করেন।

টেংরা বাজারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্থানীয় কারিগরদের শ্রম ও দক্ষতার গল্পও। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা বাঁশ-বেত দিয়ে তৈরি করে আসছেন গ্রামীণ জীবনের প্রয়োজনীয় নানা উপকরণ। এসব পণ্য শুধু বাজারে কেনাবেচাই হয় না, এগুলোর সঙ্গে টিকে আছে বাংলার গ্রামীণ কারুশিল্পের একটি পুরোনো ধারাও।

তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে বাজারের কিছু চিত্র। একসময় হাওর ও নদীর তাজা মাছের প্রাচুর্যে জমজমাট থাকত মাছের বাজার। এখন সেখানে খামারের মাছই বেশি। কদাচিৎ কুশিয়ারা নদী কিংবা হাকালুকি হাওরের মাছের দেখা মেলে। তবু পুরোনো দিনের সেই স্বাদ যেন পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।

টেংরা বাজারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হয়তো এখানেই, সময় বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে, বদলেছে কেনাকাটার ধরন; কিন্তু বাজারটি এখনো ধরে রেখেছে তার নিজস্ব প্রাণ। রোববারের হাটে মানুষের কোলাহল, গবাদিপশুর ডাক, বাঁশ-বেতের সামগ্রীর সারি আর দরদামের ব্যস্ততা মিলিয়ে তৈরি হয় গ্রামীণ জীবনের এক জীবন্ত ছবি।

স্থানীয়দের কাছে তাই টেংরা বাজার নিছক একটি বাজার নয়। এটি তাদের শিকড়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক ঐতিহ্য। শতবর্ষ পেরিয়েও যে বাজারে আজও গ্রামীণ জীবনের প্রয়োজনীয় সামগ্রীর পশরা সাজে, মানুষের ভিড় জমে, আর ফিরে আসে বাংলার চিরচেনা হাটের সেই পুরোনো আবহ।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক রেলওয়ে বার্তা

মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬


গ্রামীণ জীবনের ঐতিহ্যবাহী পসরা যে বাজারে

প্রকাশের তারিখ : ০৬ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

রোববার এলেই বদলে যায় মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার টেংরা বাজারের চেহারা। সাপ্তাহিক হাটের দিনে চারপাশজুড়ে জমে ওঠে মানুষের আনাগোনা।

কোথাও সারি সারি গরু-ছাগল, কোথাও হাঁস-মুরগি ও কবুতরের হাট। আবার কোথাও বাঁশ-বেতের তৈরি নানান সামগ্রীর পসরা।

সব মিলিয়ে যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে চেনা গ্রামীণ বাংলার পুরোনো এক ছবি।

আধুনিকতার ছোঁয়ায় দেশের অনেক গ্রামীণ বাজারের চেহারা বদলে গেলেও টেংরা বাজার এখনো ধরে রেখেছে তার পুরোনো বৈশিষ্ট্য।

প্রায় দুইশ বছরের পুরোনো এই বাজার শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, স্থানীয় মানুষের কাছে এটি গ্রামীণ জীবনযাত্রার প্রয়োজন মেটানোর অন্যতম নির্ভরতার জায়গা।

হাটের এক পাশে সাজানো থাকে বাঁশ-বেতের তৈরি গৃহস্থালির নানা সামগ্রী।

টুকরি, খলই, দুছইন, হুপা, ঝাঁকা, কুলা, চালুন, বেতের মাথাল, সেঁউতি থেকে শুরু করে শীতলপাটি ও কেয়াপাতার পাটি, কী নেই সেখানে! গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত এসব সামগ্রী দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি টেকসই হওয়ায় এখনো রয়েছে এর চাহিদা।

বাজারে ঢুকলেই চোখে পড়ে নানা ধরনের ভ্রাম্যমাণ দোকান। কোথাও দা, কোদাল, খুন্তি ও অন্যান্য লোহার সামগ্রী, কোথাও মৌসুমি সবজির স্তূপ। খাসিয়া পান, বাংলা পান ও সুপারির জন্যও রয়েছে আলাদা জায়গা। গবাদিপশুর খাবার থেকে শুরু করে ঘরের নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা সামগ্রীও মেলে এই হাটে।

রোববারের হাটে পশুর আনাগোনাও কম নয়। বাজারের এক পাশে সারি সারি গরু খুঁটিতে বাঁধা। পাশেই ছাগলের ভিড়। রাস্তার পূর্ব পাশে বসে হাঁস-মুরগি ও কবুতরের হাট। ক্রেতারা এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরে দেখছেন, করছেন দরদাম। পছন্দ হলে কিনে নিচ্ছেন প্রয়োজনের জিনিস।

স্থানীয় টেংরা বাজার নামে পরিচিত হলেও হাটের ভেতরে ভটের বাজার ও বাগিচা বাজার নামেও দুটি অংশ রয়েছে। প্রতিদিনই এখানে স্থায়ী দোকানগুলোতে বেচাকেনা চলে। তবে রোববারের সাপ্তাহিক হাটে সেই স্বাভাবিক চিত্র বদলে যায়। দূর-দূরান্ত থেকে ক্রেতা-বিক্রেতাদের আগমনে জমে ওঠে পুরো এলাকা। সকাল থেকে শুরু হওয়া বেচাকেনা অনেক সময় গড়ায় গভীর রাত পর্যন্ত।

প্রবীণ ব্যবসায়ী সুদর্শন মালাকারের কাছে টেংরা বাজার শুধু একটি ব্যবসাকেন্দ্র নয়, দীর্ঘদিনের স্মৃতিও। তিনি বলেন, প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো এই বাজার একসময় পুরো রাজনগর এলাকার অন্যতম বড় হাট ছিল। প্রতি রোববার সকাল থেকে শুরু হয়ে অনেক সময় মধ্যরাত পর্যন্ত এখানে বেচাকেনা চলত।

বাঁশ-বেতের সামগ্রী বিক্রেতা বীরেন্দ্র মালাকারও দীর্ঘদিন ধরে এই বাজারের সঙ্গে যুক্ত। প্রায় ২৫ বছর ধরে তিনি এখানে পণ্য বিক্রি করছেন। তার ভাষায়, গেরস্তালির প্রয়োজনীয় অনেক কিছুই এই বাজারে পাওয়া যায়। স্থানীয়দের পাশাপাশি শহর থেকেও অনেকে এসব পণ্য কিনতে আসেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররা পণ্য নিয়ে এসে এখানে খুচরা দরে বিক্রি করেন।

টেংরা বাজারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্থানীয় কারিগরদের শ্রম ও দক্ষতার গল্পও। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা বাঁশ-বেত দিয়ে তৈরি করে আসছেন গ্রামীণ জীবনের প্রয়োজনীয় নানা উপকরণ। এসব পণ্য শুধু বাজারে কেনাবেচাই হয় না, এগুলোর সঙ্গে টিকে আছে বাংলার গ্রামীণ কারুশিল্পের একটি পুরোনো ধারাও।

তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে বাজারের কিছু চিত্র। একসময় হাওর ও নদীর তাজা মাছের প্রাচুর্যে জমজমাট থাকত মাছের বাজার। এখন সেখানে খামারের মাছই বেশি। কদাচিৎ কুশিয়ারা নদী কিংবা হাকালুকি হাওরের মাছের দেখা মেলে। তবু পুরোনো দিনের সেই স্বাদ যেন পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।

টেংরা বাজারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হয়তো এখানেই, সময় বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে, বদলেছে কেনাকাটার ধরন; কিন্তু বাজারটি এখনো ধরে রেখেছে তার নিজস্ব প্রাণ। রোববারের হাটে মানুষের কোলাহল, গবাদিপশুর ডাক, বাঁশ-বেতের সামগ্রীর সারি আর দরদামের ব্যস্ততা মিলিয়ে তৈরি হয় গ্রামীণ জীবনের এক জীবন্ত ছবি।

স্থানীয়দের কাছে তাই টেংরা বাজার নিছক একটি বাজার নয়। এটি তাদের শিকড়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক ঐতিহ্য। শতবর্ষ পেরিয়েও যে বাজারে আজও গ্রামীণ জীবনের প্রয়োজনীয় সামগ্রীর পশরা সাজে, মানুষের ভিড় জমে, আর ফিরে আসে বাংলার চিরচেনা হাটের সেই পুরোনো আবহ।


দৈনিক রেলওয়ে বার্তা

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মো: মনিরুজ্জামান (মনির) 

কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক রেলওয়ে বার্তা । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত