ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকারের সংস্কার কর্মসূচির সঙ্গে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নীতিগত ঐকমত্য তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল তিতুমীর।
তিনি বলেছেন, জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী অর্থনৈতিক সংস্কারের যে রূপরেখা সরকার নিয়েছে, বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীরাও তার মূল লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে একমত।
একই সঙ্গে বিনিয়োগ বাড়াতে চীন, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে বহুমুখী উৎস থেকে অর্থায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বন্ধ কলকারখানা চালু করা, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং জ্বালানি খাতের বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়াও সরকারের অগ্রাধিকারে রয়েছে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) থাইল্যান্ডে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভায় অংশ নিতে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন রাশেদ আল তিতুমীর।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দ্রুত পুনর্গঠনের মাধ্যমে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়ার একটি রাজনৈতিকভাবে নির্ধারিত রূপরেখা রয়েছে। পাঁচ বছর মেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশলে এই রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। এর সঙ্গে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সংস্কার প্রস্তাবের বেশ কিছু মৌলিক বিষয়ে মিল রয়েছে।
রাশেদ আল তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশের জনগণ আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা চায়, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় কর আদায় বাড়াতে চায়, সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চায়। একই সঙ্গে বন্ধ কলকারখানা চালুর প্রত্যাশাও রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সংস্কার ভাবনার সঙ্গেও এসব লক্ষ্যের মিল রয়েছে।
তিনি বলেন, দেশীয় সংস্কারের রূপরেখার সঙ্গে আন্তর্জাতিক বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলোর নীতিগত সমঝোতা রয়েছে। লক্ষ্য ও অভিষ্টের মধ্যেও সমঝোতা আছে। সেই কারণেই সংস্কারগুলো টেকসই হবে। কারণ, সংস্কারের মালিকানা রাজনৈতিক সরকার নেবে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকারের নিজস্ব অগ্রাধিকার এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের পরামর্শের মধ্যে সমন্বয় থাকলে কর্মসূচি বাস্তবায়ন সহজ হবে। তবে সংস্কারের মূল দায়িত্ব ও মালিকানা সরকারেরই থাকবে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি খাতে বাংলাদেশের বাড়তি ব্যয়ের বিষয়টিও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনায় তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তার দাবি, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধ পরিস্থিতির পর জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমাতে সরকার জ্বালানির দাম বাজারের সঙ্গে পুরোপুরি সমন্বয় করেনি।
তিনি বলেন, আগের সরকারের সময় দারিদ্র্য বেড়েছে বলে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও উল্লেখ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে পরিবার কার্ডের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল্যায়ন অনুযায়ী, এ ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে পাঁচ বছরে দারিদ্র্যের হার প্রায় পাঁচ শতাংশ কমতে পারে।
এছাড়া জলবায়ু সহনশীলতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নে অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও আলোচনায় তুলে ধরা হয়েছে।
আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে রাশেদ আল তিতুমীর বলেন, আগের সরকারের সময়কার অনিয়ম ও ঋণসংক্রান্ত বিশৃঙ্খলার দায় এখন সাধারণ জনগণকে বহন করতে হচ্ছে। ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত আর্থিক ব্যবস্থাকে পুনরুদ্ধারে পুনঃঅর্থায়নের প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি জানান, এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থা আইএফসিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তার মতে, ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা না গেলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তিনি বলেন, অতীতে কর অব্যাহতি ও করসংক্রান্ত অনিয়মের কারণে সরকারের রাজস্ব আহরণ কমেছে। ফলে একদিকে আর্থিক ঘাটতি বেড়েছে, অন্যদিকে সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়ন খাতে প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ কঠিন হয়েছে।
তিনি বলেন, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো এবং সামাজিক সুরক্ষার বলয় গড়ে তোলার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে।
বন্ধ কলকারখানা চালু করা এবং নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত করতেও সরকার উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান রাশেদ আল তিতুমীর। এ ক্ষেত্রে সাত শতাংশ ঋণাত্মক সুদে অর্থায়নের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ করেন তিনি। তবে এ অর্থায়নের আওতা, শর্ত ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানাননি উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতিতে একদিকে শিক্ষিত ও তরুণ বেকারের সংখ্যা বেড়েছে, অন্যদিকে অনেক কলকারখানা বন্ধ রয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে উৎপাদন বাড়ানো, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার মতে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিভিন্ন সময়ে প্রবাসী শ্রমিক, তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তা এবং আনুষ্ঠানিক খাতে নারীর অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ভবিষ্যতেও উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করতে হবে।
থাইল্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক বাড়ানোর বিষয়েও ইতিবাচক অগ্রগতির কথা জানান রাশেদ আল তিতুমীর। তিনি বলেন, থাই চেম্বারের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য কয়েকটি সম্ভাবনাময় খাত তুলে ধরা হয়েছে। এসব খাতে উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মূল্য সংযোজনের সুযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে কৃষিজাত পণ্য, ফল, দুগ্ধজাত পণ্য এবং হালাল খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে থাই বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ দেখা গেছে বলে জানান তিনি। বাংলাদেশে মৌসুমে আম, কাঁঠাল ও লিচুর মতো ফলের সরবরাহ বেশি থাকলেও পর্যাপ্ত হিমাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাবে অনেক পণ্য নষ্ট হয়। কৃষকেরাও অনেক সময় ন্যায্য দাম পান না। এসব পণ্য প্রক্রিয়াজাত করে হালাল বাজারসহ আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, শুধু দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোই সরকারের লক্ষ্য নয়; বরং উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার সংযোগ গড়ে তুলে সামগ্রিক বাণিজ্য বাড়াতে চায় বাংলাদেশ।
এ ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে এমন উৎপাদন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে কোনো পণ্যের প্রাথমিক উপকরণ বাংলাদেশে উৎপাদিত হবে, মধ্যবর্তী পণ্য থাইল্যান্ডে তৈরি হবে এবং পরে চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি করা হবে। আবার কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে এর বিপরীত ব্যবস্থাও গড়ে উঠতে পারে।
রেনং-চট্টগ্রাম সমুদ্র যোগাযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা
বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর ও থাইল্যান্ডের রেনং বন্দরের মধ্যে সামুদ্রিক যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তার মতে, দুই বন্দরের মধ্যে সংযোগ আরও গতিশীল করা গেলে পণ্য পরিবহন সহজ হবে এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।
এছাড়া আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি) কাঠামোর সুবিধা কাজে লাগানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে শুল্ক সুবিধা কাজে লাগিয়ে শুধু দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নয়, বৃহত্তর আঞ্চলিক বাজারেও বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির সুযোগ বাড়তে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য, সামুদ্রিক যোগাযোগ এবং বঙ্গোপসাগরের মৎস্যসম্পদ আহরণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে থাইল্যান্ডের পক্ষ থেকে আগ্রহ দেখা গেছে। তার মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বহুমুখী উৎস থেকে অর্থায়নের চেষ্টা
সরকারের অর্থায়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে রাশেদ আল তিতুমীর বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে একাধিক উৎস থেকে অর্থায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর একটি বড় অংশ আসবে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ থেকে।
তিনি বলেন, চীনের বিনিয়োগ শুরু হয়েছে। জাপানের টয়োটা ও মারুবেনি করপোরেশনের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করেছে। এছাড়া সিলিকন ভ্যালিভিত্তিক প্লাগ অ্যান্ড প্লে এবং প্রযুক্তি খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার দাবি, বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতিগত ধারাবাহিকতার প্রত্যাশা থেকেই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হলো, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন, বিদেশি বিনিয়োগ এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণকে সমন্বিত করে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনের কাজ এগিয়ে নেওয়া।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক এবং ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা বাড়ছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ইতোমধ্যে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিতুমীর বলেন, অর্থনীতিকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে। এ জন্য সরকার আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে চায়।

সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ অক্টোবর ২০২৬
ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকারের সংস্কার কর্মসূচির সঙ্গে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নীতিগত ঐকমত্য তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল তিতুমীর।
তিনি বলেছেন, জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী অর্থনৈতিক সংস্কারের যে রূপরেখা সরকার নিয়েছে, বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীরাও তার মূল লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে একমত।
একই সঙ্গে বিনিয়োগ বাড়াতে চীন, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে বহুমুখী উৎস থেকে অর্থায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বন্ধ কলকারখানা চালু করা, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং জ্বালানি খাতের বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়াও সরকারের অগ্রাধিকারে রয়েছে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) থাইল্যান্ডে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভায় অংশ নিতে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন রাশেদ আল তিতুমীর।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দ্রুত পুনর্গঠনের মাধ্যমে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়ার একটি রাজনৈতিকভাবে নির্ধারিত রূপরেখা রয়েছে। পাঁচ বছর মেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশলে এই রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। এর সঙ্গে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সংস্কার প্রস্তাবের বেশ কিছু মৌলিক বিষয়ে মিল রয়েছে।
রাশেদ আল তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশের জনগণ আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা চায়, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় কর আদায় বাড়াতে চায়, সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চায়। একই সঙ্গে বন্ধ কলকারখানা চালুর প্রত্যাশাও রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সংস্কার ভাবনার সঙ্গেও এসব লক্ষ্যের মিল রয়েছে।
তিনি বলেন, দেশীয় সংস্কারের রূপরেখার সঙ্গে আন্তর্জাতিক বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলোর নীতিগত সমঝোতা রয়েছে। লক্ষ্য ও অভিষ্টের মধ্যেও সমঝোতা আছে। সেই কারণেই সংস্কারগুলো টেকসই হবে। কারণ, সংস্কারের মালিকানা রাজনৈতিক সরকার নেবে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকারের নিজস্ব অগ্রাধিকার এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের পরামর্শের মধ্যে সমন্বয় থাকলে কর্মসূচি বাস্তবায়ন সহজ হবে। তবে সংস্কারের মূল দায়িত্ব ও মালিকানা সরকারেরই থাকবে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি খাতে বাংলাদেশের বাড়তি ব্যয়ের বিষয়টিও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনায় তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তার দাবি, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধ পরিস্থিতির পর জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমাতে সরকার জ্বালানির দাম বাজারের সঙ্গে পুরোপুরি সমন্বয় করেনি।
তিনি বলেন, আগের সরকারের সময় দারিদ্র্য বেড়েছে বলে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও উল্লেখ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে পরিবার কার্ডের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল্যায়ন অনুযায়ী, এ ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে পাঁচ বছরে দারিদ্র্যের হার প্রায় পাঁচ শতাংশ কমতে পারে।
এছাড়া জলবায়ু সহনশীলতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নে অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও আলোচনায় তুলে ধরা হয়েছে।
আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে রাশেদ আল তিতুমীর বলেন, আগের সরকারের সময়কার অনিয়ম ও ঋণসংক্রান্ত বিশৃঙ্খলার দায় এখন সাধারণ জনগণকে বহন করতে হচ্ছে। ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত আর্থিক ব্যবস্থাকে পুনরুদ্ধারে পুনঃঅর্থায়নের প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি জানান, এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থা আইএফসিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তার মতে, ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা না গেলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তিনি বলেন, অতীতে কর অব্যাহতি ও করসংক্রান্ত অনিয়মের কারণে সরকারের রাজস্ব আহরণ কমেছে। ফলে একদিকে আর্থিক ঘাটতি বেড়েছে, অন্যদিকে সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়ন খাতে প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ কঠিন হয়েছে।
তিনি বলেন, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো এবং সামাজিক সুরক্ষার বলয় গড়ে তোলার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে।
বন্ধ কলকারখানা চালু করা এবং নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত করতেও সরকার উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান রাশেদ আল তিতুমীর। এ ক্ষেত্রে সাত শতাংশ ঋণাত্মক সুদে অর্থায়নের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ করেন তিনি। তবে এ অর্থায়নের আওতা, শর্ত ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানাননি উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতিতে একদিকে শিক্ষিত ও তরুণ বেকারের সংখ্যা বেড়েছে, অন্যদিকে অনেক কলকারখানা বন্ধ রয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে উৎপাদন বাড়ানো, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার মতে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিভিন্ন সময়ে প্রবাসী শ্রমিক, তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তা এবং আনুষ্ঠানিক খাতে নারীর অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ভবিষ্যতেও উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করতে হবে।
থাইল্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক বাড়ানোর বিষয়েও ইতিবাচক অগ্রগতির কথা জানান রাশেদ আল তিতুমীর। তিনি বলেন, থাই চেম্বারের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য কয়েকটি সম্ভাবনাময় খাত তুলে ধরা হয়েছে। এসব খাতে উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মূল্য সংযোজনের সুযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে কৃষিজাত পণ্য, ফল, দুগ্ধজাত পণ্য এবং হালাল খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে থাই বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ দেখা গেছে বলে জানান তিনি। বাংলাদেশে মৌসুমে আম, কাঁঠাল ও লিচুর মতো ফলের সরবরাহ বেশি থাকলেও পর্যাপ্ত হিমাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাবে অনেক পণ্য নষ্ট হয়। কৃষকেরাও অনেক সময় ন্যায্য দাম পান না। এসব পণ্য প্রক্রিয়াজাত করে হালাল বাজারসহ আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, শুধু দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোই সরকারের লক্ষ্য নয়; বরং উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার সংযোগ গড়ে তুলে সামগ্রিক বাণিজ্য বাড়াতে চায় বাংলাদেশ।
এ ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে এমন উৎপাদন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে কোনো পণ্যের প্রাথমিক উপকরণ বাংলাদেশে উৎপাদিত হবে, মধ্যবর্তী পণ্য থাইল্যান্ডে তৈরি হবে এবং পরে চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি করা হবে। আবার কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে এর বিপরীত ব্যবস্থাও গড়ে উঠতে পারে।
রেনং-চট্টগ্রাম সমুদ্র যোগাযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা
বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর ও থাইল্যান্ডের রেনং বন্দরের মধ্যে সামুদ্রিক যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তার মতে, দুই বন্দরের মধ্যে সংযোগ আরও গতিশীল করা গেলে পণ্য পরিবহন সহজ হবে এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।
এছাড়া আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি) কাঠামোর সুবিধা কাজে লাগানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে শুল্ক সুবিধা কাজে লাগিয়ে শুধু দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নয়, বৃহত্তর আঞ্চলিক বাজারেও বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির সুযোগ বাড়তে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য, সামুদ্রিক যোগাযোগ এবং বঙ্গোপসাগরের মৎস্যসম্পদ আহরণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে থাইল্যান্ডের পক্ষ থেকে আগ্রহ দেখা গেছে। তার মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বহুমুখী উৎস থেকে অর্থায়নের চেষ্টা
সরকারের অর্থায়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে রাশেদ আল তিতুমীর বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে একাধিক উৎস থেকে অর্থায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর একটি বড় অংশ আসবে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ থেকে।
তিনি বলেন, চীনের বিনিয়োগ শুরু হয়েছে। জাপানের টয়োটা ও মারুবেনি করপোরেশনের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করেছে। এছাড়া সিলিকন ভ্যালিভিত্তিক প্লাগ অ্যান্ড প্লে এবং প্রযুক্তি খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার দাবি, বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতিগত ধারাবাহিকতার প্রত্যাশা থেকেই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হলো, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন, বিদেশি বিনিয়োগ এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণকে সমন্বিত করে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনের কাজ এগিয়ে নেওয়া।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক এবং ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা বাড়ছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ইতোমধ্যে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিতুমীর বলেন, অর্থনীতিকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে। এ জন্য সরকার আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে চায়।

আপনার মতামত লিখুন