ঢাকা   বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক রেলওয়ে বার্তা

ডেঙ্গুর টিকা: ট্রায়াল নাকি সরাসরি প্রয়োগ?



ডেঙ্গুর টিকা: ট্রায়াল নাকি সরাসরি প্রয়োগ?

দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ইতোমধ্যে এক লাখ ছাড়িয়েছে। মৃত্যু ছাড়িয়েছে ৩০০। এখন প্রতিদিন দুই হাজারের বেশি মানুষ বিভিন্ন বয়সে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু প্রতিরোধের উপায় হিসেবে আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ডেঙ্গুর টিকা। বর্তমানে যে টিকাটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে, তার নাম ‘কিউডেঙ্গা’। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ইতোমধ্যে এই টিকাকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি এমন এলাকায় শিশু-কিশোরদের মধ্যে টিকাটি দেওয়ার সুপারিশ করেছে।

এদিকে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ডেঙ্গুর টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনা করা হবে, নাকি টিকা ব্যবহারের আগে বিদ্যমান গবেষণা পর্যালোচনা করা হবে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করবে সরকার। বাংলাদেশে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনা করতে হবে, নাকি বিদ্যমান পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা করে নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব, তা নিয়ে ওই বৈঠকে বিশ্লেষণ করা হবে।

দেশে ডেঙ্গুর টিকার অনুমোদনের বিষয়ে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেন, টিকার অনুমোদন অবশ্যই এর নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা-সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে দিতে হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে টিকাটি কতটা কার্যকর হবে, তা যাচাই করা জরুরি।

দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ এবং মৃত্যু ৩০০ ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ডেঙ্গুর টিকা চালুর বিষয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। জাপানের টাকেডা ফার্মাসিউটিক্যালসের ‘কিউডেঙ্গা’ টিকা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন পেয়েছে। সরকার দেশে টিকা চালুর ক্ষেত্রে নতুন করে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালাবে নাকি বিদ্যমান আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফল পর্যালোচনা করে অনুমোদন দেবে, তা নিয়ে শিগগিরই বিশেষজ্ঞ কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

তিনি বলেন, কোনো টিকার অনুমোদন দেওয়ার আগে আমাদের বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রয়োজন। আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে টিকাটি কীভাবে কাজ করবে, সেটা বুঝতে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করা হবে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ও ভাইরোলজির বিশেষজ্ঞ গবেষকদের সঙ্গে সরকার শিগগির বৈঠক করবে। বাংলাদেশে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনা করতে হবে, নাকি বিদ্যমান পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা করে নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব, তা নিয়ে ওই বৈঠকে বিশ্লেষণ করা হবে।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জানান, ডেঙ্গুর টিকা উন্নয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে এবং আন্তর্জাতিকভাবে কয়েকটি টিকা বিবেচনাধীন রয়েছে। ভারত সম্প্রতি বেসরকারি খাতে ব্যবহারের জন্য একটি ডেঙ্গুর টিকার অনুমোদন দিয়েছে। পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া ব্যাপকভাবে টিকা ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা থাকার কারণে যেকোনো টিকার বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন অপরিহার্য। কোনো টিকা চলমান ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারবে বলে মনে হয় না। তবে, আগামী বছরগুলোতে সংক্রমণ প্রতিরোধে তা সহায়তা করতে পারে।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত জাপানি কিউডেঙ্গা টিকা ডেঙ্গু প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে— মনে করছেন অনেকে / ছবি- সংগৃহীত

এর আগে, ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী দ্য ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ-এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে দেখা যায়, ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরির ক্ষেত্রে কিউডেঙ্গা টিকা কার্যকর। টিকাটি অনুমোদনের আগে বিভিন্ন ধাপে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা টিআইডিইএস (TIDES)। এ পরীক্ষায় আটটি দেশের ৪ থেকে ১৬ বছর বয়সী ২০ হাজার ৯৯৯ জন শিশু-কিশোর অংশ নেয়। তাদের মধ্যে কেউ আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল, আবার কেউ আক্রান্ত হয়নি। তাদের দুই ডোজ টিকার মধ্যে ব্যবধান ছিল তিন মাস। এ গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, টিকার কার্যকারিতার কারণে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ৮০ শতাংশ এবং হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঝুঁকি ৯৫ শতাংশ কমে গেছে।

আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী দ্য ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ-এ প্রকাশিত টিআইডিইএস (TIDES) গবেষণায় দেখা গেছে, কিউডেঙ্গা টিকা ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কার্যকর। চার থেকে ১৬ বছর বয়সী শিশুদের ওপর পরীক্ষিত এই টিকা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ৮০ শতাংশ এবং হাসপাতালে ভর্তির ঝুঁকি ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হওয়ায় এই টিকার নিরাপত্তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই বলে মনে করেন চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা।

টিকা বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম বারী বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন-সাপেক্ষে বর্তমানে বিশ্বের ৪৪টি দেশে ডেঙ্গুর টিকা ব্যবহার করা হচ্ছে। সরকার চাইলে নিজস্ব উদ্যোগে এই টিকা দেশে নিয়ে আসতে পারে, কিংবা বেসরকারি কোনো কোম্পানিকে দায়িত্ব দিলে তারাও এটি আমদানি করে দেশের জন্য সরবরাহ করতে পারে। বর্তমানে ডেঙ্গুর যে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে, তাতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। সরকার এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত পদক্ষেপ নিলে ওষুধ প্রশাসন শাখাকে নির্দেশনা দেওয়া সম্ভব হবে, যাতে এই টিকাকে দ্রুত লাইসেন্স দেওয়া যায়।’

ল্যানসেটের গবেষণা অনুযায়ী এই টিকা ডেঙ্গুতে আক্রান্তের ঝুঁকি ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনতে সক্ষম / ছবি- সংগৃহীত

তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে আমাদের দেশে জাতীয় কারিগরি কমিটি ও টেকনিক্যাল কমিটি রয়েছে। তারা এ বিষয়ে একটি বিশেষ বৈঠক ডেকে ডেঙ্গুর বর্তমান ভয়াবহ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে সিদ্ধান্ত নেবেন। বৈঠকে যদি তারা এই টিকা ব্যবহারের পরামর্শ দেন, তবে সরকার সেই অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। এই কারিগরি কমিটিতে যারা যুক্ত আছেন, তাদের সবার মতামতের ভিত্তিতেই মূলত এই টিকা আমদানির প্রক্রিয়া ও লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত করতে পারবে সরকার।

কোনো টিকার অনুমোদন দেওয়ার আগে আমাদের বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রয়োজন। আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে টিকাটি কীভাবে কাজ করবে, সেটা বুঝতে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করা হবে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ও ভাইরোলজির বিশেষজ্ঞ গবেষকদের সঙ্গে সরকার শিগগির বৈঠক করবে।

সরকার দেশে ডেঙ্গুর টিকা চালুর কথা ভাবছে— জানিয়ে চলতি মাসের শুরুতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ডেঙ্গুর টিকার ব্যয় বেশি হওয়ায় সেটির কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও গ্যাভির সঙ্গে আলোচনা চলছে। আন্তর্জাতিক নির্দেশিকা অনুসরণ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

আগে ডেঙ্গু আক্রান্ত হোক বা না হোক, পরীক্ষা ছাড়াই চার থেকে ষাট বছর বয়সীরা এই টিকা নিতে পারে / ছবি- সংগৃহীত

বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে কিউডেঙ্গা টিকা কতটা কার্যকর— এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বায়োলজিক্যালস ডেভেলপমেন্ট কর্মসূচির সাবেক প্রোগ্রাম ম্যানেজার ও নেদারল্যান্ডসের টিকা উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ, প্রখ্যাত ইমিউনোলজিস্ট ড. রেজাউল করিমের কাছে জানতে চাওয়া হয়। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, “ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউরোপিয়ান মেডিসিনস এজেন্সির অত্যন্ত কঠোর মূল্যায়ন ও স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া সফলভাবে পেরিয়ে টাকেডা ফার্মাসিউটিক্যালসের ‘কিউডেঙ্গা’ ডেঙ্গুর টিকা অনুমোদন পেয়েছে। এর আগে ডেঙ্গুর জন্য ব্যবহৃত সানোফির ‘ডেংভ্যাক্সিয়া’ টিকার ক্ষেত্রে কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল। বিশেষ করে যারা আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে পরবর্তী সংক্রমণ আরও মারাত্মক রূপ নেওয়ায় জটিলতা তৈরি হয়েছিল। ফলে সেটি বাজার থেকে তুলে নেওয়া হয়। কিন্তু কিউডেঙ্গার ক্ষেত্রে তেমন কোনো ঝুঁকি বা নেতিবাচক প্রভাব পাওয়া যায়নি।”

বর্তমানে ডেঙ্গুর যে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে, তাতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। সরকার এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত পদক্ষেপ নিলে ওষুধ প্রশাসন শাখাকে নির্দেশনা দেওয়া সম্ভব হবে, যাতে এই টিকাকে দ্রুত লাইসেন্স দেওয়া যায়।

— টিকা বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম বারী

‘এই টিকা আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং আক্রান্ত হননি এমন উভয় গোষ্ঠীই কোনো পূর্বপরীক্ষা ছাড়াই নিরাপদে গ্রহণ করতে পারে। এর নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন টিকার নিরাপত্তা ও কার্যকারিতার বিষয়ে বিশ্বের অন্যতম কঠোর ও মানসম্মত নিয়ন্ত্রক সংস্থা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রি-অ্যাপ্রুভালের চেয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিজস্ব বিশেষজ্ঞ কমিটির মূল্যায়ন অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও শক্তিশালী হিসেবে বিবেচিত হয়। ইউরোপে মানবাধিকার এবং প্রতিটি নাগরিকের জীবনের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা থাকায় তাদের অনুমোদিত ওষুধ বা টিকা চোখ বন্ধ করে বিশ্বব্যাপী ব্যবহার করা যায়। অতীতে কিছু টিকার ক্ষেত্রে ট্রায়ালে জটিলতা থাকলেও কিউডেঙ্গা টিকাটি ব্রাজিল, থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনের মতো ডেঙ্গুপ্রবণ বিভিন্ন দেশে এবং ইউরোপের কঠোর মানদণ্ডে পরীক্ষিত।’ 

ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল নাকি গবেষণা পর্যালোচনা—কোন প্রক্রিয়ায় অনুমোদন দেওয়া হবে, তা নিয়ে ভাবছে সরকার

ইউরোপে মানবাধিকার এবং প্রতিটি নাগরিকের জীবনের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা থাকায় তাদের অনুমোদিত ওষুধ বা টিকা চোখ বন্ধ করে বিশ্বব্যাপী ব্যবহার করা যায়। অতীতে কিছু টিকার ক্ষেত্রে ট্রায়ালে জটিলতা থাকলেও কিউডেঙ্গা টিকাটি ব্রাজিল, থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনের মতো ডেঙ্গুপ্রবণ বিভিন্ন দেশে এবং ইউরোপের কঠোর মানদণ্ডে পরীক্ষিত।

— প্রখ্যাত ইমিউনোলজিস্ট ড. রেজাউল করিমের

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ডেঙ্গুর প্রকোপ এবং শিশুসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় এই কার্যকর টিকা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন এই বিজ্ঞানী। দেশে অর্থের কোনো অভাব নেই এবং সঠিকভাবে জীবনরক্ষাকারী মানসম্মত পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অতীতে কিছু অপ্রয়োজনীয় ও নিম্নমানের টিকা বা ট্রায়ালের নামে অনিয়ম করা হলেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও এফডিএ (FDA) অনুমোদিত কিউডেঙ্গা টিকার নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিয়ে কোনো সংশয়ের অবকাশ নেই। তাই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পরীক্ষিত ও নিরাপদ হওয়ায় বাংলাদেশে এই কিউডেঙ্গা টিকা গ্রহণে কোনো বাধা বা সমস্যা থাকার কথা নয় বলে তিনি মনে করেন।

হাম-ডেঙ্গু-নিউমোনিয়া একাকার শিশু ওয়ার্ডে, সংক্রমণ ঠেকাবে কে?

এ বিষয়ে প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, ডেঙ্গু বাংলাদেশে নতুন কোনো রোগ নয়, আমরা ২০০০ সাল থেকে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়ছি। এখন ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও বেশি খারাপ পর্যায়ের দিকে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হচ্ছে টিকা বা ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা করা। ডেঙ্গু জ্বরের কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই, নেই কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধও। টিকা বা ভ্যাকসিনই ডেঙ্গু প্রতিরোধের একমাত্র কার্যকর ব্যবস্থা।  

‘বর্তমানে যে কিউডেঙ্গা টিকাটি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেটি জাপানের একটি কোম্পানির তৈরি। টিকাটির একটি বৈশিষ্ট্য হলো— আগে কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে থাকুক বা না থাকুক, উভয় ক্ষেত্রেই এটি দেওয়া যায়। টিকা দেওয়ার আগে ডেঙ্গু সংক্রমণের পরীক্ষা করার প্রয়োজন নেই। চার বছর বয়সী শিশু থেকে ৬০ বছরের প্রাপ্তবয়স্ক যেকোনো ব্যক্তি টিকাটি নিতে পারবে। পৃথিবীর অনেক দেশেই ইতোমধ্যে টিকাটির ব্যবহার শুরু হয়েছে। এই টিকা ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধেই কার্যকর বলে প্রমাণিত।’

বর্তমানে যে কিউডেঙ্গা টিকাটি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেটি জাপানের একটি কোম্পানির তৈরি। টিকাটির একটি বৈশিষ্ট্য হলো— আগে কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে থাকুক বা না থাকুক, উভয় ক্ষেত্রেই এটি দেওয়া যায়। টিকা দেওয়ার আগে ডেঙ্গু সংক্রমণের পরীক্ষা করার প্রয়োজন নেই। চার বছর বয়সী শিশু থেকে ৬০ বছরের প্রাপ্তবয়স্ক যেকোনো ব্যক্তি টিকাটি নিতে পারবে। পৃথিবীর অনেক দেশেই ইতোমধ্যে টিকাটির ব্যবহার শুরু হয়েছে। এই টিকা ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধেই কার্যকর বলে প্রমাণিত।

— প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ

শুধু তাই নয়, কিউডেঙ্গার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া খুবই কম— উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘কিউডেঙ্গা টিকাটি চার বছর পর্যন্ত সুরক্ষা দেয়, প্রায় ৭০ শতাংশের ক্ষেত্রে চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধেই। ডেংভ্যাক্সিয়া এখনও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বীকৃতি না পেলেও কিউডেঙ্গার অনুমোদন মিলেছে।’

টিকার অনুমোদন অবশ্যই এর নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা-সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে দিতে হবে— স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত / ঢাকা পোস্ট

ডা. আবদুল্লাহ বলেন, আমাদের দেশে অনেকেই কিউডেঙ্গা টিকা ব্যবহারের পক্ষপাতী, বিশেষ করে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের একটি বড় অংশ শিশু ও কিশোর। তাই ছয় থেকে ১৬ বছর বয়সীদের ডেঙ্গুর সংক্রমণ থেকে বাঁচানোর জন্য টিকা দেওয়া উচিত বলে অনেকে মনে করেন। তবে অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, আরও কিছুদিন অপেক্ষা করা ভালো। অনেক দেশে টিকাটি ব্যবহৃত হচ্ছে, যদি ফলাফলটা ইতিবাচক, কার্যকর ও ভালো হয়; ভবিষ্যতে হয়তো আমাদের দেশেও এই টিকা দেওয়ার বিষয়টি চিন্তাভাবনা করা যেতে পারে।   

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক রেলওয়ে বার্তা

বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬


ডেঙ্গুর টিকা: ট্রায়াল নাকি সরাসরি প্রয়োগ?

প্রকাশের তারিখ : ১৪ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ইতোমধ্যে এক লাখ ছাড়িয়েছে। মৃত্যু ছাড়িয়েছে ৩০০। এখন প্রতিদিন দুই হাজারের বেশি মানুষ বিভিন্ন বয়সে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু প্রতিরোধের উপায় হিসেবে আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ডেঙ্গুর টিকা। বর্তমানে যে টিকাটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে, তার নাম ‘কিউডেঙ্গা’। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ইতোমধ্যে এই টিকাকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি এমন এলাকায় শিশু-কিশোরদের মধ্যে টিকাটি দেওয়ার সুপারিশ করেছে।

এদিকে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ডেঙ্গুর টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনা করা হবে, নাকি টিকা ব্যবহারের আগে বিদ্যমান গবেষণা পর্যালোচনা করা হবে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করবে সরকার। বাংলাদেশে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনা করতে হবে, নাকি বিদ্যমান পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা করে নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব, তা নিয়ে ওই বৈঠকে বিশ্লেষণ করা হবে।

দেশে ডেঙ্গুর টিকার অনুমোদনের বিষয়ে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেন, টিকার অনুমোদন অবশ্যই এর নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা-সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে দিতে হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে টিকাটি কতটা কার্যকর হবে, তা যাচাই করা জরুরি।

দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ এবং মৃত্যু ৩০০ ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ডেঙ্গুর টিকা চালুর বিষয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। জাপানের টাকেডা ফার্মাসিউটিক্যালসের ‘কিউডেঙ্গা’ টিকা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন পেয়েছে। সরকার দেশে টিকা চালুর ক্ষেত্রে নতুন করে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালাবে নাকি বিদ্যমান আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফল পর্যালোচনা করে অনুমোদন দেবে, তা নিয়ে শিগগিরই বিশেষজ্ঞ কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

তিনি বলেন, কোনো টিকার অনুমোদন দেওয়ার আগে আমাদের বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রয়োজন। আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে টিকাটি কীভাবে কাজ করবে, সেটা বুঝতে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করা হবে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ও ভাইরোলজির বিশেষজ্ঞ গবেষকদের সঙ্গে সরকার শিগগির বৈঠক করবে। বাংলাদেশে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনা করতে হবে, নাকি বিদ্যমান পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা করে নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব, তা নিয়ে ওই বৈঠকে বিশ্লেষণ করা হবে।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জানান, ডেঙ্গুর টিকা উন্নয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে এবং আন্তর্জাতিকভাবে কয়েকটি টিকা বিবেচনাধীন রয়েছে। ভারত সম্প্রতি বেসরকারি খাতে ব্যবহারের জন্য একটি ডেঙ্গুর টিকার অনুমোদন দিয়েছে। পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া ব্যাপকভাবে টিকা ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা থাকার কারণে যেকোনো টিকার বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন অপরিহার্য। কোনো টিকা চলমান ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারবে বলে মনে হয় না। তবে, আগামী বছরগুলোতে সংক্রমণ প্রতিরোধে তা সহায়তা করতে পারে।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত জাপানি কিউডেঙ্গা টিকা ডেঙ্গু প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে— মনে করছেন অনেকে / ছবি- সংগৃহীত

এর আগে, ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী দ্য ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ-এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে দেখা যায়, ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরির ক্ষেত্রে কিউডেঙ্গা টিকা কার্যকর। টিকাটি অনুমোদনের আগে বিভিন্ন ধাপে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা টিআইডিইএস (TIDES)। এ পরীক্ষায় আটটি দেশের ৪ থেকে ১৬ বছর বয়সী ২০ হাজার ৯৯৯ জন শিশু-কিশোর অংশ নেয়। তাদের মধ্যে কেউ আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল, আবার কেউ আক্রান্ত হয়নি। তাদের দুই ডোজ টিকার মধ্যে ব্যবধান ছিল তিন মাস। এ গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, টিকার কার্যকারিতার কারণে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ৮০ শতাংশ এবং হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঝুঁকি ৯৫ শতাংশ কমে গেছে।

আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী দ্য ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ-এ প্রকাশিত টিআইডিইএস (TIDES) গবেষণায় দেখা গেছে, কিউডেঙ্গা টিকা ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কার্যকর। চার থেকে ১৬ বছর বয়সী শিশুদের ওপর পরীক্ষিত এই টিকা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ৮০ শতাংশ এবং হাসপাতালে ভর্তির ঝুঁকি ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হওয়ায় এই টিকার নিরাপত্তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই বলে মনে করেন চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা।

টিকা বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম বারী বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন-সাপেক্ষে বর্তমানে বিশ্বের ৪৪টি দেশে ডেঙ্গুর টিকা ব্যবহার করা হচ্ছে। সরকার চাইলে নিজস্ব উদ্যোগে এই টিকা দেশে নিয়ে আসতে পারে, কিংবা বেসরকারি কোনো কোম্পানিকে দায়িত্ব দিলে তারাও এটি আমদানি করে দেশের জন্য সরবরাহ করতে পারে। বর্তমানে ডেঙ্গুর যে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে, তাতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। সরকার এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত পদক্ষেপ নিলে ওষুধ প্রশাসন শাখাকে নির্দেশনা দেওয়া সম্ভব হবে, যাতে এই টিকাকে দ্রুত লাইসেন্স দেওয়া যায়।’

ল্যানসেটের গবেষণা অনুযায়ী এই টিকা ডেঙ্গুতে আক্রান্তের ঝুঁকি ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনতে সক্ষম / ছবি- সংগৃহীত

তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে আমাদের দেশে জাতীয় কারিগরি কমিটি ও টেকনিক্যাল কমিটি রয়েছে। তারা এ বিষয়ে একটি বিশেষ বৈঠক ডেকে ডেঙ্গুর বর্তমান ভয়াবহ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে সিদ্ধান্ত নেবেন। বৈঠকে যদি তারা এই টিকা ব্যবহারের পরামর্শ দেন, তবে সরকার সেই অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। এই কারিগরি কমিটিতে যারা যুক্ত আছেন, তাদের সবার মতামতের ভিত্তিতেই মূলত এই টিকা আমদানির প্রক্রিয়া ও লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত করতে পারবে সরকার।

কোনো টিকার অনুমোদন দেওয়ার আগে আমাদের বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রয়োজন। আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে টিকাটি কীভাবে কাজ করবে, সেটা বুঝতে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করা হবে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ও ভাইরোলজির বিশেষজ্ঞ গবেষকদের সঙ্গে সরকার শিগগির বৈঠক করবে।

সরকার দেশে ডেঙ্গুর টিকা চালুর কথা ভাবছে— জানিয়ে চলতি মাসের শুরুতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ডেঙ্গুর টিকার ব্যয় বেশি হওয়ায় সেটির কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও গ্যাভির সঙ্গে আলোচনা চলছে। আন্তর্জাতিক নির্দেশিকা অনুসরণ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

আগে ডেঙ্গু আক্রান্ত হোক বা না হোক, পরীক্ষা ছাড়াই চার থেকে ষাট বছর বয়সীরা এই টিকা নিতে পারে / ছবি- সংগৃহীত

বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে কিউডেঙ্গা টিকা কতটা কার্যকর— এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বায়োলজিক্যালস ডেভেলপমেন্ট কর্মসূচির সাবেক প্রোগ্রাম ম্যানেজার ও নেদারল্যান্ডসের টিকা উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ, প্রখ্যাত ইমিউনোলজিস্ট ড. রেজাউল করিমের কাছে জানতে চাওয়া হয়। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, “ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউরোপিয়ান মেডিসিনস এজেন্সির অত্যন্ত কঠোর মূল্যায়ন ও স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া সফলভাবে পেরিয়ে টাকেডা ফার্মাসিউটিক্যালসের ‘কিউডেঙ্গা’ ডেঙ্গুর টিকা অনুমোদন পেয়েছে। এর আগে ডেঙ্গুর জন্য ব্যবহৃত সানোফির ‘ডেংভ্যাক্সিয়া’ টিকার ক্ষেত্রে কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল। বিশেষ করে যারা আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে পরবর্তী সংক্রমণ আরও মারাত্মক রূপ নেওয়ায় জটিলতা তৈরি হয়েছিল। ফলে সেটি বাজার থেকে তুলে নেওয়া হয়। কিন্তু কিউডেঙ্গার ক্ষেত্রে তেমন কোনো ঝুঁকি বা নেতিবাচক প্রভাব পাওয়া যায়নি।”

বর্তমানে ডেঙ্গুর যে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে, তাতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। সরকার এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত পদক্ষেপ নিলে ওষুধ প্রশাসন শাখাকে নির্দেশনা দেওয়া সম্ভব হবে, যাতে এই টিকাকে দ্রুত লাইসেন্স দেওয়া যায়।

— টিকা বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম বারী

‘এই টিকা আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং আক্রান্ত হননি এমন উভয় গোষ্ঠীই কোনো পূর্বপরীক্ষা ছাড়াই নিরাপদে গ্রহণ করতে পারে। এর নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন টিকার নিরাপত্তা ও কার্যকারিতার বিষয়ে বিশ্বের অন্যতম কঠোর ও মানসম্মত নিয়ন্ত্রক সংস্থা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রি-অ্যাপ্রুভালের চেয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিজস্ব বিশেষজ্ঞ কমিটির মূল্যায়ন অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও শক্তিশালী হিসেবে বিবেচিত হয়। ইউরোপে মানবাধিকার এবং প্রতিটি নাগরিকের জীবনের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা থাকায় তাদের অনুমোদিত ওষুধ বা টিকা চোখ বন্ধ করে বিশ্বব্যাপী ব্যবহার করা যায়। অতীতে কিছু টিকার ক্ষেত্রে ট্রায়ালে জটিলতা থাকলেও কিউডেঙ্গা টিকাটি ব্রাজিল, থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনের মতো ডেঙ্গুপ্রবণ বিভিন্ন দেশে এবং ইউরোপের কঠোর মানদণ্ডে পরীক্ষিত।’ 

ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল নাকি গবেষণা পর্যালোচনা—কোন প্রক্রিয়ায় অনুমোদন দেওয়া হবে, তা নিয়ে ভাবছে সরকার

ইউরোপে মানবাধিকার এবং প্রতিটি নাগরিকের জীবনের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা থাকায় তাদের অনুমোদিত ওষুধ বা টিকা চোখ বন্ধ করে বিশ্বব্যাপী ব্যবহার করা যায়। অতীতে কিছু টিকার ক্ষেত্রে ট্রায়ালে জটিলতা থাকলেও কিউডেঙ্গা টিকাটি ব্রাজিল, থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনের মতো ডেঙ্গুপ্রবণ বিভিন্ন দেশে এবং ইউরোপের কঠোর মানদণ্ডে পরীক্ষিত।

— প্রখ্যাত ইমিউনোলজিস্ট ড. রেজাউল করিমের

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ডেঙ্গুর প্রকোপ এবং শিশুসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় এই কার্যকর টিকা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন এই বিজ্ঞানী। দেশে অর্থের কোনো অভাব নেই এবং সঠিকভাবে জীবনরক্ষাকারী মানসম্মত পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অতীতে কিছু অপ্রয়োজনীয় ও নিম্নমানের টিকা বা ট্রায়ালের নামে অনিয়ম করা হলেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও এফডিএ (FDA) অনুমোদিত কিউডেঙ্গা টিকার নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিয়ে কোনো সংশয়ের অবকাশ নেই। তাই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পরীক্ষিত ও নিরাপদ হওয়ায় বাংলাদেশে এই কিউডেঙ্গা টিকা গ্রহণে কোনো বাধা বা সমস্যা থাকার কথা নয় বলে তিনি মনে করেন।

হাম-ডেঙ্গু-নিউমোনিয়া একাকার শিশু ওয়ার্ডে, সংক্রমণ ঠেকাবে কে?

এ বিষয়ে প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, ডেঙ্গু বাংলাদেশে নতুন কোনো রোগ নয়, আমরা ২০০০ সাল থেকে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়ছি। এখন ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও বেশি খারাপ পর্যায়ের দিকে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হচ্ছে টিকা বা ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা করা। ডেঙ্গু জ্বরের কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই, নেই কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধও। টিকা বা ভ্যাকসিনই ডেঙ্গু প্রতিরোধের একমাত্র কার্যকর ব্যবস্থা।  

‘বর্তমানে যে কিউডেঙ্গা টিকাটি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেটি জাপানের একটি কোম্পানির তৈরি। টিকাটির একটি বৈশিষ্ট্য হলো— আগে কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে থাকুক বা না থাকুক, উভয় ক্ষেত্রেই এটি দেওয়া যায়। টিকা দেওয়ার আগে ডেঙ্গু সংক্রমণের পরীক্ষা করার প্রয়োজন নেই। চার বছর বয়সী শিশু থেকে ৬০ বছরের প্রাপ্তবয়স্ক যেকোনো ব্যক্তি টিকাটি নিতে পারবে। পৃথিবীর অনেক দেশেই ইতোমধ্যে টিকাটির ব্যবহার শুরু হয়েছে। এই টিকা ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধেই কার্যকর বলে প্রমাণিত।’

বর্তমানে যে কিউডেঙ্গা টিকাটি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেটি জাপানের একটি কোম্পানির তৈরি। টিকাটির একটি বৈশিষ্ট্য হলো— আগে কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে থাকুক বা না থাকুক, উভয় ক্ষেত্রেই এটি দেওয়া যায়। টিকা দেওয়ার আগে ডেঙ্গু সংক্রমণের পরীক্ষা করার প্রয়োজন নেই। চার বছর বয়সী শিশু থেকে ৬০ বছরের প্রাপ্তবয়স্ক যেকোনো ব্যক্তি টিকাটি নিতে পারবে। পৃথিবীর অনেক দেশেই ইতোমধ্যে টিকাটির ব্যবহার শুরু হয়েছে। এই টিকা ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধেই কার্যকর বলে প্রমাণিত।

— প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ

শুধু তাই নয়, কিউডেঙ্গার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া খুবই কম— উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘কিউডেঙ্গা টিকাটি চার বছর পর্যন্ত সুরক্ষা দেয়, প্রায় ৭০ শতাংশের ক্ষেত্রে চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধেই। ডেংভ্যাক্সিয়া এখনও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বীকৃতি না পেলেও কিউডেঙ্গার অনুমোদন মিলেছে।’

টিকার অনুমোদন অবশ্যই এর নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা-সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে দিতে হবে— স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত / ঢাকা পোস্ট

ডা. আবদুল্লাহ বলেন, আমাদের দেশে অনেকেই কিউডেঙ্গা টিকা ব্যবহারের পক্ষপাতী, বিশেষ করে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের একটি বড় অংশ শিশু ও কিশোর। তাই ছয় থেকে ১৬ বছর বয়সীদের ডেঙ্গুর সংক্রমণ থেকে বাঁচানোর জন্য টিকা দেওয়া উচিত বলে অনেকে মনে করেন। তবে অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, আরও কিছুদিন অপেক্ষা করা ভালো। অনেক দেশে টিকাটি ব্যবহৃত হচ্ছে, যদি ফলাফলটা ইতিবাচক, কার্যকর ও ভালো হয়; ভবিষ্যতে হয়তো আমাদের দেশেও এই টিকা দেওয়ার বিষয়টি চিন্তাভাবনা করা যেতে পারে।   


দৈনিক রেলওয়ে বার্তা

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মো: মনিরুজ্জামান (মনির) 

কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক রেলওয়ে বার্তা । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত